Office Address

BRAC University, Building 07, Level 09, 43 Mohakhali C/A Dhaka,1212, Bangladesh

Phone Number

02-9844051

Email Address

cpj@bracu.ac.bd

উইম্যান পিস ক্যাফে, শান্তি-সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় রোল মডেল

November 2, 2022 মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম ও মোঃ আশিকুর রহমান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্য, শান্তি ও সম্প্রীতির পৃথিবী গড়তে সবসময়ই নারী-পুরুষের অবদানকে সমান চোখে দেখেছেন। তাইতো তিনি পুরুষদের সর্বেসর্বা মনোভাবকে দলিত করে তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন অমোঘ সত্য; দ্বিধাহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন সাম্যের বাণী— ‘সাম্যের গান গাই/ আমার চক্ষে পুরুষ রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই।/ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/ বিশ্বে যা কিছু এলো পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি/ অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’

বাঙালি সমাজ, বিশেষ করে নারী সমাজ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারে নিমজ্জিত, শিক্ষার আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়ে ঘরের চার দেওয়ালে আবদ্ধ, এমনই এক সময়ে আর্বিভাব বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের। এই মহীয়সী নারী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে শত অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা উপেক্ষা করে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়েছিলেন তাদের জাগ্রত করতে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সেসময় তিনি বলেছিলেন- ‘আমরা কেন উপার্জ্জন করিব না? আমাদের কি হাত নেই, না পা নেই, না বুদ্ধি নেই? কি নেই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকাজে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা আমরা কি স্বাধীন ব্যবসা করতে পারব না? এই যে নারীর জাগরণ ও ক্ষমতায়নে বেগম রোকেয়ার সুদূরপ্রসারী ভাবনা, বর্তমানে তার অতিক্রমণ ঘটেছে।’ একইসাথে তিনি নারীদেরকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। আলোকিত করতে চেয়েছিলেন নারী জাতিকে। তিনি বলেছিলেন- ‘আমরা জড়ো অলংকাররূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ।’

কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আছে তাঁদের আদর্শ, ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি, চেতনা এবং তাদের দেখানো পথ। তাঁদের স্বপ্ন থেকে প্রসারিত হওয়া নারী ক্ষমতায়ন এবং অধিকার বাস্তবায়নের আজ অনেকটা পথ এগিয়ে চলেছে দেশ কিংবা দেশের বাইরেও। নারীদের মুক্তচিন্তার যে বীজ তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিকর্মে বপন করে গেছেন আজ এবং আরো শত বছর পরও যে নারী সমাজ তা বহন করবে তা নিশ্চিত বলা যায়।

সময়ের প্রেক্ষাপট আজ অনেক পরিবর্তিত। এক সময় যে বিষয়গুলো চিন্তাও করা যেতনা আজ তা অনেক বেশি দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ সমাজের উন্নয়নমূলক নানা কাজে প্রজেক্ট হিসেবে প্রপোজাল তৈরি করছে এবং সেই প্রপোজালের উপর ভিত্তি করে অনুদানও পাচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়ন-দাতা সংস্থার কাছ থেকে। শিক্ষার্থী অবস্থায় পাচ্ছেন অভিজ্ঞতা এবং কাজের বিশাল সুযোগ। সাধারণত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাগুলো সামাজিক ইস্যুতে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য কাজ করছে কিন্তু শিক্ষার্থী অবস্থায় সেই দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ খুব একটা দেখা যেতনা আগে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই দক্ষতা প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস এন্ড জাস্টিস এবং ইউএন উইম্যান এর যৌথ একটি কর্মসূচি “উইম্যান পিস ক্যাফে”। ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই একাডেমিক ইনস্টিটিউট, মানসম্পন্ন শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সামাজিক ন্যায্যতা প্রচারে কাজ করে যাচ্ছেন ২০১৭ সাল থেকে।

ক্যাম্পাসভিত্তিক এই ক্যাফের সদস্যরা শিক্ষার্থী অবস্থায় সামাজিক নানা ইস্যু নিয়ে কাজ করছে। দেশের প্রায় ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিস ক্যাফের ৬৮০জন সদস্য নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, লিঙ্গ সমতা, সাম্য-শান্তি-সম্প্রীতি, ন্যাযতা, পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক জ্ঞান, তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ে নারীদের মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এছাড়াও মহামারী কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে সমাজে শান্তি সম্প্রীতি বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে দেশের প্রায় ২৩টি জেলায়।

মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এমন কার্যক্রম বিকাশে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগ ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের এবং উত্তরাঞ্চলীয় বিভাগ রংপুরে নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার শাখাওয়াত হোসেনের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল “উইম্যান পিস ক্যাফে”। বর্তমানে ঢাকার ভিতর আরো দুটি বিশ্ববিদ্যালয়, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়) সহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে “এশিয়ান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান” চট্টগ্রামেও স্থাপন করা হয়েছে পিস ক্যাফে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ না রেখে শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ন্যায্যতা রক্ষায় কাজ করবে এমন চিন্তা থেকেই ক্যাম্পাসভিত্তিক এই পিস ক্যাফের আইডিয়া। এর সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এটিকে কেবল অর্থ দিয়ে নয় বরং মূল্যায়ন করতে হবে আরো বড় কিছু দিয়ে। খুব অল্প সময়ে পিস ক্যাফে অনেক কিছু অর্জন করেছে দেশ এবং দেশের বাইরে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসানওবিই জানান, দেশ হিসেবে আমাদের বয়স এখন ৫০ বছর। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন আন্দোলন পরিবর্তিত হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে। আগামী দিনে নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হিসেবে দেখতে চাই। পিস ক্যাফে এমন একটি মাধ্যম যা এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পিস ক্যাফেকে আমরা কেবল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই নয় বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে দিতে চাই। এটাই আমাদের স্বপ্ন। আমাদের তরুণ সমাজ এটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে যাতে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য দূরদর্শী কিছু করতে পারে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং এর মতে, পিস ক্যাফের উপযোগিতা ক্লাসরুমের সীমানাকেও অতিক্রম করে। ক্লাসরুমে বসে বসে কেবল নোট নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই উদ্যোগটিকে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ এটা শিক্ষার্থীদের, শিক্ষার জন্য সর্বোপরি সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো একটি উদ্যোগ। পিস ক্যাফে হলো এমন একটি সৃজনশীল উদ্যোগ, যা নারী নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগ এবং নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত ও পরামর্শ দিয়ে সমাজে শান্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রচার করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন দক্ষতা তৈরি করা, যাতে তাঁরা সমাজে শান্তি প্রচারে উৎসাহী হন ও শান্তির দূত হয়ে ওঠেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, সমাজ নারীদের প্রতি যে একধরনের মানসিকতা প্রকাশ করে যে নারীদের দ্বারা কিছু হয়না, এটি এখন ভাঙার সময় হয়েছে। নারীরা শুধু মা কিংবা বোন হয়ে আমাদের সাথে থাকবেন তা নয়, তারা আমাদের যোগ্য সহকর্মী হিসেবে থাকবেন। জল-স্থল-অন্তরীক্ষে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে পিস ক্যাফে ধারাবাহিকভাবে  কার্যকরী,  সময়োপযোগী ও বহুমাত্রিক কাজ করে যাচ্ছে, আমি তাদের কার্যক্রম দেখে আমি অভিভূত হয়েছি। সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় তাদের এসব কাজের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি এবং আমি মনে করি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ  উপর্যুক্ত লেখাটি লেখকের নিজস্ব ভাবনা ও অভিজ্ঞতালব্ধ  মত। তা কোনভাবেই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বা মতামত হিসেবে বিবেচিত নয়।

লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার তারুণ্যের ক্যাম্পাস পাতায় ৩১ অক্টোবর ২০২২ তারিখে প্রকাশিত।